"তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বই" বিভাগে করেছেন
ই-লার্ণিং বিষয়ে একটি রচনা প্রতিবেদন

image

1 উত্তর

+2 টি ভোট
করেছেন

বিষয়ঃ ই-লার্নিং

ভূমিকাঃ ই-লার্নিং হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক লার্নিং। মূলত ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দূরবর্তী স্থান থেকে শিক্ষা কার্যক্রমকে ই-লার্ণিং বলা হয়। ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতী বলতে এখানে কম্পিউটার ডিভাইস, ইন্টারনেট এক্সেস যোগ্য ডিভাইস, এমনকি টেলিভিশনও হতে পারে।

বর্তমানে ই-লার্নিং বলতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দুরের শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকের ক্লাসে জয়েন করে শেখার প্রক্রিয়াকে ই-লার্ণিং বলা হয়। ই-লার্নিং অনেকটা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মত কাজ করে। যেখানে আমরা দূরে বসেও সকলেই কনফারেন্সের মাধ্যমে একত্রিত হতে পারি। আমাদের কাছে মনে হবে যেন আমরা শিক্ষকের সামনে কোন শ্রেণি কক্ষে বসে আছি।

পৃথিবীর নানা পরিবেশ রয়েছে যেখানে ভিন্ন ভিন্ন দুর্গম অঞ্চলেও মানুষ বসবাস করেন। কিন্তু এসকল বিশেষ বিশেষ স্থান কম হওয়ার কারনে স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা যেমন সম্ভব হয়না তেমনি শিক্ষক পাঠানোও সম্ভব হয়না। সেক্ষেত্রে শুধু মাত্র ইন্টারনেট সংযোগ সেই এলাকায় পৌছে দিয়া কম্পিউটারের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা পৌছে দেওয়া সম্ভব। এছাড়াও কোন কারনে যেমন কোন এলাকায় রোগ জীবানূর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সাময়িক বাইরের পরিবেশে যেতে বাধার সৃষ্টি হলেও সেখানে ই-লার্নিং কার্যকর হয়। কারন শিক্ষা এমন একটি জ্ঞান যা মানুষের সকল আচার আচরন জ্ঞান বিজ্ঞান ইত্যাদি শিখিয়ে তাহাকে মহৎ মানুষ হতে সাহায্য করে তাই শিক্ষার কোন বিকল্প হয়না যে সাময়িকভাবে শিক্ষা বন্ধ রাখা হবে। বরং প্রতিবন্ধকতা গুলোর বিকল্প খুজে আমাদের শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে হবে।

করোনাকালে স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম চালু না রাখার যৌক্তিকতাঃ
প্রাণ অমুল্য। এর সাথে আর কিছুর তুলনা হয়না। বলা হয়ে থাকে সময় অমুল্য সম্পদ। যে সময় চলে যায় তা আর কখনো কোন অবস্থায়ই ফিরিয়ে আনা যায়না। পৃথিবীর সকল সম্পদ দিয়াও ফিরিয়া আনা যায় না। কিন্তু তা অপেক্ষা প্রান আরও অধিক। কেননা সময় ফিরিয়ে আনা না গেলেও কিছু আর্থিক ক্ষতি ছাড়া আর কিছু হবার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু প্রান চলে গেলে আপনার জন্য এ বিশ্বটাই শেষ হয়ে যাবে। তাই যেকোন মূল্য প্রান রক্ষা একান্ত জরুরী এবং তা সর্বাজ্ঞে।
মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ একটি সমাজে দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে এবং প্রকৃতির বুকে যেখানে যখন খুশি নানা কাজে বিচরন করে। কিন্তু একই সাথে  এই পৃথিবী নানা জীবানুতে ভরা। চোখে দেখা যাক আর নাই যাক, আমরা জানি আর নাই নাই যানি, আমাদের চারপাশে হাজারও জীবানূ রয়েছে। এসকল জীবানূর কোনটি কখন তীব্র ভাবে আমাদের আক্রান্ত করতে পারে তা আমাদের কারও জানা নাই। বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায় এক এক সময় একটি জীবানূ মহামারী হয়ে এসে একটি এলাকার অধিকাংশ মানুষের জীবন নাশের কারন হয়েছে। ঠিক এমনি একটি জীবানূ হুমকি আজ আমাদের মাঝে আসছে।
সূদুর চীন থেকে COVID-19 নামের করোনা ভাইরাস পায়নডেমিক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।
তাই এই জীবানূর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা পেতে বাইরের পরিবেশ এড়িয়ে আমাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রন করে বাড়িতে বসে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। কেননা এই রোগের এখনো পর্যন্ত কোন ঔষধ বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। করোনা ভাইরাসটি তীব্র আক্রমনাত্মক। এবং সোয়াচে আকার ধারন করেছে, এটি মানুষ থেকে মানুষে হাচি কাশি, বায়ু ইত্যাদি মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে অতি দ্রুত। এই সঙ্গকট সময়ে তাই নিজেদের সুস্থ্য ও নিরাপদ রাখতে বাড়িতে থাকা একান্ত জরুরি। একারনে জনসমাগমযুক্ত স্থান বা স্কুল কলেজের মত স্থান যেখানে শিক্ষার্থীদের সমাবেশ থাকে সেগুলো বন্ধ রাখা একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। যদি অসচেতন ভাবে শ্রেণি কার্যক্রম করতে যেয়ে একজনও কেউ আক্রান্ত হয়ে পড়ে তবে তা দ্রুত এক শিক্ষার্থী থেকে অপরজন, তাদের থেকে বাড়িতে মা বাবা ভাই বোন সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার  আশংকা থাকে। আবার তাদের মাধ্যমে এলাকা , সমাজ ও দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে খুব সহজে।  তাই সর্বোচ্চ ১০০% সুস্থ্যতা বজায় রাখতে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রাখা একান্ত কর্তব্য।

ই-লার্নিং এর ধারনাঃ
ভয়েস ওভার ইন্টারিনেট প্রটোকলের (VOIP) মাধ্যমে একজন মানুষ ভয়েস বা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যে অনেকজনের সাথে একই সাথে সরাসরি কথা বলতে পারেন এবং দেখতেও পারেন। ওয়েব ক্যামেরার বিকাশ ঘটার ফলে সরাসরি ভিডিও স্ট্রিমিং সুবিধ্যার সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রযুক্তি দ্বারা একজন মানুষ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যেকোন বিষয়ে আলোচনা করলে তা কনফারেন্স হয়ে সকলের কাছে পৌছাতে পারে। এভাবে শিক্ষক তার একটি সম্পুর্ণ ক্লাস স্ট্রিমিং করতে পারেন। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয়েছে ই-লার্ণিং প্রক্রিয়া।

ই-লার্নিং এর সুবিধাসমুহঃ-
ইলার্নিং এমন এক প্রযুক্তি যেখানে সরাসরি দৈহিক বা শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই ভার্চুয়াল উপস্থিতি সম্ভব । ফলে। কোন স্থানে না যেয়ে সেখানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া সম্ভব বলে বর্তমানে ই-লার্ণিং এর বিশেষ সুবিধা হচ্ছেঃ-

১। অসুস্থ্যতা জনিতে কারনে ক্লাসে উপস্থিত হতে না পেরেও বাড়ি বসে ক্লাস করার সুবিধা।
২। বহুদূরের কোন ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ক্লাসে দুর থেকেও ক্লাসে যোগদান করতে পারা।
৩। শুধু কম্পিউটার ও ইন্টারনেট থাকলেই যেকোন স্থান থেকে ক্লাসে যোগদান করতে পারা।
৪। স্মার্টফোনের মাধ্যমে বাইরে যাতায়াতের সময়ও ক্লাসে যোগদান সম্ভব।
৫। মহামারীর কারনে স্কুল কলেজ বন্ধ হলে ঘরে বসে শীক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা।
৬। সুবিধা বঞ্চিত এলাকায় শিক্ষার আলো পৌছে দেওয়া সম্ভব।
৭। গ্রামে ভাল শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান না থাকলেও শহরের মান সম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরে কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহন সম্ভব।
৮। অনলাইনে ক্লাসের লেকচার ভিডীও রেখে দেওয়া সম্ভব বলে, কেউ কোন কারনে ক্লাস মিস করলে তা সুবিধামত সময়ে আবারও দেখে নেওয়া সম্ভব।

ই-লার্ণিং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমুহঃ-

ই-লার্ণিং প্রক্রিয়া খুবই সহজ ও অনেক সুবিধা থাকা সত্বেও এর বাস্তবায়নে কিছুটা সমস্যা রয়েছে।
নিম্নে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জসমুহ হচ্ছেঃ-
১। সকলের কাছে ভাল মানের কম্পিউটার বা ল্যাপটপ পৌছাতে হবে। দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের ভাল মানের ল্যাপটপ কেনা কষ্টসাধ্য। কমপক্ষে একটি ভাল মোবাইল ফোন দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে ভাল একটি ব্রান্ড মোবাইলের এখনো পর্যন্ত যথেষ্ট দাম তাই সবার হাতে ডিভাইস পৌছানোটা একটা চ্যালেঞ্জ।
২। দেশের সকল স্থানে বিশেষ করে যেখানে বেশি প্রয়োজন যেমন গ্রামে হাই স্পিড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌছে দেওয়া। এটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা আমাদের দেশে এখনো ভাল কোন ফাইবার অপটিক লাইন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। আর হাই স্পিড ইন্টারনেট ছাড়া ই-লার্ণিং বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
৩। ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য গরীব ছাত্রছাত্রীদের ব্যান্ডউইথ কেনার অন্তরায়। ক্লাসের লাইভ স্ট্রিমিং এ যথেষ্ট ব্যান্ডউইথ প্রয়োজন যা স্বল্পমূল্যে দিতে হবে যাতে সবাই ব্যবহার করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারী নীতি ছাড়া সম্ভব নয়।
৩। ই-লার্ণিং এর সুযোগে অনেকেই তার অপ-ব্যবহার করতে পারে। এসব অপব্যবহার রোধে তাই প্রয়োজন শক্তিশালী একটি আইনি প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়ন কমিটি।
৪। সর্বাজ্ঞে সকল ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা বা স্কুল কলেজের কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা করে সেখানে সবাইকে ট্রেন করাতে হবে।


ই-লার্নিং এর মাধ্যমে কাঙ্খিত দক্ষতা অর্জনঃ-
ই-লার্ণিং এর মাধ্যমে প্রায় সকল ধরনের দক্ষতা অর্জন সম্ভব। গাড়ি পরিচালনার প্রশিক্ষন থেকে অনেক প্রশিক্ষন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে দক্ষতা অর্জন সম্ভব।
শুধু মাত্র বাস্তব প্রয়োগের কিছুটা ঘাটতি থাকলে কোন বিষয়ে সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জন এবং দক্ষতা সম্ভব।
তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পরিপূর্ন যোগ্যতা বা দক্ষ হওয়া সম্ভব। যেমন ই-কমার্স ব্যবসা বানিজ্য পরিচালনা, কলসেন্টার। ফ্রিলান্সিং। ফাই ম্যানেজ মেন্ট, ডাটাবেজ ম্যানেজমেন্ট, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়ার তৈরি, গ্রাফিক্স ডিজাইন। ভিডীও এনিমেশন খাত ইত্যাদিতে পরিপূর্ন দক্ষতা অর্জন করে বাস্তব প্রয়োগ করে পেশা ও ক্যারিয়ার গঠন করা পূর্ণ ভাবে সম্ভব।

স্বাভাবিক সময়ে শিক্ষার সহায়তা হিসাবে ই-লার্নিং এর সুবিধাঃ
শুধু মাত্র সঙ্গকট কালীন নয়। যেকোন স্বাভাবিক সময়েও ই-লার্ণিং বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
যেকেউ যেকোন সময়ে ই-লার্ণিং এর মাধ্যমে শুধু ক্লাস করা নয় বরং বিষয় বস্তু সম্পর্কে রিসার্চ করতে ই-লার্নিং ব্যবহার করতে পারে। এর মাধ্যমে দেশ বিদেশের বড় বড় লাইব্রেরীর সাথে যুক্ত হয়ে সহায়ক অতিরিক্ত জ্ঞানার্জন সম্ভব।
এছাড়া গ্রামে উচ্চ ও শহরের মানসম্মত শিক্ষাও গ্রামে পৌছে দেওয়া যায় বলে ই-লার্ণিং এর সম্ভাবনা যেকোন সময়ে সমানগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শুধু মাত্র বিশেষ সময়ের জন্য নয় বারং স্বাভাবিক সময়েও ই-লার্নিং একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষন প্রক্রিয়া।

উপসংহারঃ -
পরিশেষে বলা যায় যে ই-লার্ণিং একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যম। এটির মাধ্যমে আধুনিক যুগে বিশ্বের যেকোন স্থান থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহন বা শীক্ষা পরিচালনা করতে পারি। এই ব্যবস্থা আমাদের অতিরিক্ত দক্ষতা প্রদান করতে পারে। শুধু আপদকালীন সময়ে নয় বরং এটি স্বাভাবিক সময়েও কার্যকর ভাবে বিশ্বের সকল জনগোষ্ঠীকে শীক্ষার আলো পৌছে দিতে পারে এই ই-লার্ণিং। তাই আমাদের উচিত এটি যত দ্রুত সম্ভব গ্রহন করে এর চ্যালেঞ্জ গুলো মোকাবেলা করে একটি অবাধ শীক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামো গড়ে তোলা। তবেই সকলেই উন্নত জ্ঞানের সঙ্গস্পর্শে আসতে পারবে। উন্নত জীবন ও দেশ উন্নয়নে ভুমিকা রাখতে পারবে। তবেই দেশ জাতি হবে উন্নত ও ডিজিটাল এক আধুনিক সুন্দর বিশ্ব ও নবযুগের সূচনা ।



সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

7 জন সক্রিয় সদস্য
0 জন নিবন্ধিত সদস্য 7 জন অতিথি
আজকে পরিদর্শন : 3214
...